সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ ও খেজুর গাছের রস

 

 

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ।ছয়টি ঋতুর মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু হচ্ছে শীত।হেমন্তের প্রস্থানে শীতের আগমন ঘটে।কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে প্রকৃতি।এরই ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি রোদের লুকোচুরি এ যেন শীত কালকেই জানান দিচ্ছে।কুয়াশা ঢাকা প্রকৃতিপাখির কলকাকলিমিষ্টি রোদ আর এক গ্লাস টাটকা খেজুর রসে জমে উঠে শীতের আমেজ।শুধু কি তাইগাছিদের ব্যস্ততায় গল্পটাও রঙ বদলায়।খেজুর গাছ গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত এক গাছবিশেষ করে গাছটির সকলের কাছে সমাদৃত তার সুমিষ্ট রসের জন্য।আশ্বিন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহ(অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি)পর্যন্ত সময়ে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়।ঠান্ডা আবহাওয়াকুয়াশাচ্ছন্ন সকাল রসের জন্য উপযোগী।তাছাড়াপৌষ ও মাঘ মাস(ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি)খেজুর গাছে বেশি রস পাওয়া যায়।শীতের তীব্রতা কমার সাথে সাথে রসের পরিমাণও কমতে থাকে।প্রতিদিন বিকেলে গাছিরা খেজুর গাছের রস বের করার জন্য গাছের মাথার অংশ পরিষ্কার করে সাদা অংশ বের করে।এই সাদা অংশে মাটির কলসি বা ঘটি বেধেঁ দেয়।সারারাত টুপ টুপ করে কলসি ও ঘটিতে জমা হতে থাকে মিষ্টি রস।পরদিন কাকভোরে গাছিরা সংগ্রহ করে এই রস।মিষ্টি রসের মৌ মৌ গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়,আর এই গন্ধে ভিড় জামায় পিপড়া,জড়ো হয় পাখি,গুণ গুণ গান গায় মৌমাছি।বিভিন্ন স্থানেহাট- বাজারে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয় খেজুরের রস।কেউ কেউ কাঁচা খেজুরের রস খেতে পছন্দ করে আবার কেউ কেউ খেজুর রসের গুড়।গাছিদের সংগ্রহ করা খেজুর রস থেকেই খেজুর গুড় তৈরি করা শুরু করে গুড় শিল্পীরা।খেজুরের রস চুলায় জ্বাল দিয়ে গুড় শিল্পীরা তৈরি করে পাটালি গুড়।পাটালি গুড় দিয়ে তৈরি করা হয় হরেক রকমের পিঠাপুলি।আমাদের দেশে শীত মানেই পিঠাপুলির আমেজ।আর এই পিঠাপুলির তালিকায় আছে ধোঁয়া উঠানো ভাপা পিঠা,দুধ চিতই,পুলি পিঠা পাটিসাপটাগুড়ের পায়েশ ইত্যাদি।যা বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক।শুধু তাই নয়খেজুর গাছের রস যথেষ্ট পুষ্টিগুণ সম্পন্ন।এই রসে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি যা আমাদের এনার্জি বা শক্তি দিয়ে থাকে। তাই খেজুরের রসকে প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংকও বলা হয়ে থাকে। 

 

আগে প্রায় অনেক এলাকায় রাস্তার দু'পাশে খেজুর গাছ দেখা যেত।গাছিরা কাকভোরে খেজুর রস সংগ্রহ করে কলসি কাঁধে নিয়ে খেজুর রস বিক্রয় করত বিভিন্ন এলাকায়। আর এই খেজুর রসের জন্য প্রতীক্ষারত থাকতো এলাকার মানুষ।বর্তমানে এই চিত্র বিরল।আগের মত দেখা যায় না খেজুর গাছ আর সেইসাথে খেজুর রস বিক্রেতাদের।দিন দিন কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের পরিমাণ।বিভিন্ন এলাকায় খেজুর গাছ দেখা মেললেও তা পরিত্যক্তঝোপঝাড়ের আড়ালে।এসব গাছ থেকে রস উত্তোলণ করা হচ্ছে না।নয়রায়ণের ফলে গাছগুলো কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে আবার ইটের ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে খেজুর গাছ।খেজুর গাছের সংখ্যা কম হওয়ায় গাছিরাও খেজুর রস উত্তোলণে বিমুখ।অনেক গাছিরা নিজেদের পেশা পরিবর্তন করেছে।কোমড়ে দড়ি বেধেঁহাতে কাঁচি নিয়ে মাটির কলসে রস উত্তোলণের চিত্র গ্রাম বাংলায় দেখা মেলা দুষ্কর।এই চিত্র শুধু স্থিরচিত্রে বা বইয়ের পাতায়ই শোভা পাবে।আমাদের বাবা- মা,দাদা- দাদীদের মুখে কত শুনেছি খেজুর রস ও গুড়ের কাহিনী।আমারাও খেয়েছি তবে বর্তমানে খেজুর রসের দেখা তেমন মেলে না।আর এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আছে যারা বেশি মুনাফার আশায় খেজুর গুড়ের সাথে চিনি মিশিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে খেজুর গুড়।এমন চলতে থাকলে আমাদের নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত হবে আমাদের ঐতিহ্য থেকে।কালের গহব্বরে হারিয়ে যাবে খেজুর রসের ঐতিহ্য।এমতবস্থায় আমাদের গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।গ্রাম পর্যায়ে খেজুর গাছগুলো শনাক্ত করে এগুলো রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।খেজুর বাগান তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।খেজুর গাছিদের আর্থিক  সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।তবেই রক্ষা পাবে আমাদের ঐতিহ্য খেজুর গাছ ও খেজুর গাছের রস

 

খন্দকার নাঈমা আক্তার নুন 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় 

 

 

 

 
Posted in Personal Blogs on January 09 2021 at 04:13 PM

Comments (0)

No login
color_lens
gif