৬৫ লাখ কোটি টাকার ॥ ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

 
 
 
#আজ এনইসিতে অনুমোদন
 
#জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৮.২০ শতাংশ নির্ধারণ
 
#এক কোটি ১৯ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
 
#বিনিয়োগের টার্গেট জিডিপির ৩৭.৪০ শতাংশ
 
 
প্রায় ৬৫ লাখ কোটি টাকার ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আজ মঙ্গলবার অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে উত্থাপন করা হচ্ছে। পাঁচ বছর মেয়াদী এই পরিকল্পনার আওতায় দেশে এক কোটি ১৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫১ শতাংশে উন্নীত করা, বিনিয়োগ জিডিপির ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশে বাড়ানো এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে পরিকল্পনার পাঁচ বছরে খরচ হবে ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ (দেশীয়) উৎস থেকে খরচের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ৪৮ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ৭৪ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। দেশীয় উৎসের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ লাখ ৩০ হাজার ১২০ কোটি টাকা এবং ব্যক্তি খাত থেকে ৫২ লাখ ৬৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ইতোমধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে পরবর্তী পাঁচটি অর্থবছরে বাস্তবায়নের জন্য অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করা হয়েছে। পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ শুনে তিনি এতে সম্মতিও দিয়েছেন। তার সম্মতিতেই আজ মঙ্গলবার (২৯ ডিসেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে এই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। অনুমোদন পেলে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এটি বাস্তবায়ন করবে সরকার।
 
সরকারের উন্নয়ন রূপকল্প ও নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে এ পরিকল্পনার নীতি ধারাবাহিকতার দিকটিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) লক্ষ্যগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
 
 
এনইসিতে উপস্থাপনের জন্য তৈরি সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় গুণগত শিক্ষা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও কোভিড-১৯ সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট সাময়িক বেকারত্বসহ বিদেশ ফেরত কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃজনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এছাড়া শ্রমবাজরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করা, আয় বৈষম্য কমানো, সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা, টেকসই নগরায়ণ, সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর প্রকল্প’ বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
 
 
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পরিকল্পনায় ২০২৫ সাল নাগাদ কর-জিডিপির অনুপাত বর্তমানের ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ করা হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং বাণিজ্য শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমাতে এই দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব আইন আরও বেশি সংস্কারের মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারী- বেসরকারী অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
 
৫ বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ॥ গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ধাক্কায় সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সরকারের হিসাব বলছে, ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, করোনা মহামারীর ধাক্কা এখনও শেষ হয়নি। বরং আগামী কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী এর জের চলবে।
 
তবে এর মধ্যেও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। এতে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শেষে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।
 
৫ বছরে কর্মসংস্থান সৃজন ॥ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে নতুন এক কোটি ১৯ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে ৮৪ লাখ ২০ হাজার এবং প্রবাসে ৩৫ লাখ কর্মসংস্থান ধরা হয়েছে। তবে কর্মসংস্থানের এই লক্ষ্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার তুলনায় ১০ লাখ কম।
 
জিইডির প্রক্ষেপণে বলা হয়েছে, পরিকল্পনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনের মূলে রয়েছে কর্মসংস্থান। আগামী ৫ বছরের মধ্যে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ২২ লাখ ৮০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এরমধ্যে দেশীয় ১৫ লাখ ৮০ হাজার ও প্রবাসে সাত লাখ। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ১৬ লাখ ২০ হাজার ও প্রবাসে সাত লাখ মিলিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি হবে ২৩ লাখ ২০ হাজার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ২৩ লাখ ৮০ হাজার। এরমধ্যে দেশীয় ১৬ লাখ ৮০ হাজার ও প্রবাসে সাত লাখ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই লক্ষ্য কিছুটা কম ২১ লাখ ২০ হাজার। এরমধ্যে দেশীয় ১৪ লাখ ২০ হাজার ও প্রবাসে সাত লাখ। আর পরিকল্পনার শেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় ১৮ লাখ ১০ হাজার ও প্রবাসে সাত লাখ মিলিয়ে মোট কর্মসংস্থান ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ১০ হাজার।
 
উল্লেখ্য, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় গত পাঁচ বছরে (২০১৬-২০) মোট কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ। এর মধ্যে দেশীয় ১ কোটি ৯ লাখ ও বিদেশী ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃজনের লক্ষ্য ছিল। পাঁচ বছর শেষে অবশ্য লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি, কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ৯৫ লাখ এর মধ্যে দেশীয় ৬০ লাখ ও প্রবাসে ৩৫ লাখ।
 
বিনিয়োগ ॥ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছরে বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে মোট জিডিপির ৩৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে অর্থবছর ভিত্তিক লক্ষ্য হচ্ছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে জিডিপির ২০ দশমিক ৮ শতাংশ, ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ, ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ, ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ ও ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ আসবে বিনিয়োগ থেকে।
 
মূল্যস্ফীতি ॥ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পাঁচ বছর শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, ৫ দশমিক ২ শতাংশ, ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলন করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়।
 
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস মহামারী খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। কেননা আশা করা হচ্ছে আগামী একবছরের মধ্যেই করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তারপর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যতই বাড়বে, প্রবৃদ্ধিও ততই বাড়বে। ফলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে, সেটি যথেষ্টই যৌক্তিক।
 
তিনি বলেন, পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা পূরণ হবে। রাতারাতি তো এই কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। পাঁচ বছর ধরে এই কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এখানে দেশের অভ্যন্তরে যেমন, তেমনি প্রবাসীদের বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে। তাছাড়া সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে তুলনা করলে এই লক্ষ্যমাত্রাটিও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
 
আজ (মঙ্গলবার) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে গণভবন থেকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরবেন। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীগণ উপস্থিত থাকবেন।
 
উল্লেখ্য, গত ২৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবন গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সামনে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। যেখানে বলা হয়, পাঁচ বছরের জন্য এই পরিকল্পনায় অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন দিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক দিকগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কর্মসংস্থান বাড়ানো, জিডিপি প্রবৃদ্ধির উর্ধগতি ধরে রেখে বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কমিয়ে আনা এবং বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে। আশা প্রকাশ করা হয়, আগামী পাঁচটি বছরকে সামনে রেখে যেভাবে প্রাক্কলনগুলো করা হয়েছে, সেগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ধরে পরিকল্পনাটির সারসংক্ষেপ শুনেন। এ সময় এই পরিকল্পনা শুনে সন্তষ্টি প্রকাশ করে কিছু বিষয়ে পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, ‘এটি অনেক ভাল পরিকল্পনা হয়েছে। আমি যে রকম চেয়েছি, সে রকমই হয়েছে।’
 
জানা যায়, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আগের মতো কার্যকর পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এজন্য পরিকল্পনা দলিলে জাতীয় অগ্রাধিকার সামষ্টিক ও খাতভিত্তিক ১৫টি ক্ষেত্র পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের লক্ষ্যে ১০৪টি সূচকসম্বলিত একটি ফলাফলভিত্তিক পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামো সংযোজন করা হয়েছে। এই কাঠামোর ভিত্তিতে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পরিকল্পনা দলিলের মধ্যবর্তী ও সমাপ্ত মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
Posted in News Blogs on December 29 2020 at 03:28 AM

Comments (0)

No login
color_lens
gif